মূল: হোমারের ওডিসি
ডায়লগ প্রকাশে : আমিন খান (Aamin Khan)
ট্রয়ের যুদ্ধ ও ওডিসিইউস: কথোপকথন
ছাত্র: আচ্ছা স্যার, ওডিসিইউস কি স্বেচ্ছায় ট্রয়ের যুদ্ধে গিয়েছিলেন?
শিক্ষক: একদমই না। ওডিসিইউস ছিলেন ইথাকা দ্বীপের রাজা। তিনি তাঁর স্ত্রী, ছোট সন্তান আর নিজের রাজ্যকে ভীষণ ভালোবাসতেন। ইথাকা ছেড়ে অত দূরে ট্রয় নগরীতে গিয়ে যুদ্ধ করার কোনো ইচ্ছাই তাঁর ছিল না।
ছাত্র: তাহলে কি তিনি ভীতু ছিলেন? যুদ্ধে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন?
শিক্ষক: মোটেও না! ওডিসিইউস ছিলেন অত্যন্ত সাহসী এবং বিচক্ষণ। যুদ্ধের ময়দানে যেখানে অন্য বীরেরা পিছিয়ে আসতেন, সেখানে তিনি নির্ভয়ে এগিয়ে যেতেন। তিনি আসলে ছিলেন একজন শান্তিপ্রিয় মানুষ। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তাঁকে যেতেই হয়েছিল।
ছাত্র: কিন্তু পরিস্থিতিটা ঠিক কী ছিল? কেন এমন একটা বিশাল যুদ্ধ শুরু হলো যা দশ বছর ধরে চলল?
শিক্ষক: এর মূলে ছিল ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস। তিনি একবার স্পার্টার রাজা ম্যেনিলাউসের রাজ্যে অতিথি হয়ে এসেছিলেন। গ্রিকরা তখন অতিথিদের খুব সমাদর করত। রাজা ম্যেনিলাউসও প্যারিসকে অনেক যত্ন করেছিলেন।
ছাত্র: তারপর কী হলো?
শিক্ষক: হঠাৎ রাজা ম্যেনিলাউসকে একটা বিশেষ কাজে রাজ্যের বাইরে যেতে হলো। তিনি প্যারিসকে নিজের রাজপ্রাসাদেই রেখে যান। কিন্তু ম্যেনিলাউস ফিরে এসে দেখেন এক সর্বনাশ হয়ে গেছে!
ছাত্র: কী সর্বনাশ?
শিক্ষক: প্যারিস চলে গেছেন, আর যাবার সময় ম্যেনিলাউসের স্ত্রী, অর্থাৎ স্পার্টার রানী হেলেনকেও সাথে করে নিয়ে গেছেন। এই খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই গ্রিক রাজাদের মধ্যে প্রচণ্ড উত্তেজনা দেখা দেয়।
ছাত্র: তার মানে সবাই রানী হেলেনকে উদ্ধার করতে একজোট হলো?
শিক্ষক: ঠিক তাই। রানী হেলেনকে উদ্ধার করতে এবং ট্রজানদের উচিত শিক্ষা দিতে গ্রিক রাজারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন। প্রায় এক হাজার যুদ্ধ-জাহাজ নিয়ে তাঁরা ট্রয়ের দিকে রওনা হলেন। আর সেই বিশাল বাহিনীর সাথে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাম লেখাতে হলো বিচক্ষণ রাজা ওডিসিইউসকে।
ট্রয়ের অন্তহীন যুদ্ধ ও দেব-দেবীর খেলা:
ছাত্র: ওডিসিইউস কি কোনোভাবে যুদ্ধ এড়াতে চেষ্টা করেননি, স্যার?
শিক্ষক: খুব চেষ্টা করেছিলেন! তিনি রটিয়ে দিলেন যে তিনি পাগল হয়ে গেছেন। রাজা ম্যেনিলাউসের দূত যখন তাঁর কাছে এল, ওডিসিইউস তখন পাগলের অভিনয় করছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না, দূত তাঁর চালাকি ধরে ফেলল। বাধ্য হয়েই তাঁকে রণক্ষেত্রে নামতে হলো।
ছাত্র: আচ্ছা স্যার, গ্রিকদের তো বিশাল সেনাবাহিনী ছিল, তাও কেন যুদ্ধটা দশ বছর ধরে চলল?
শিক্ষক: এর প্রধান কারণ ছিল ট্রয় নগরীর সেই বিশাল প্রাচীর। ট্রয় ছিল চারদিকে খুব শক্তিশালী প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, যা ভাঙা গ্রিকদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ট্রোজানরাও ছিল সমান সাহসী। দুপক্ষই প্রাণপণ লড়ত, প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হতো, কিন্তু জয়-পরাজয় নির্ধারিত হচ্ছিল না।
ছাত্র: আমি কোথাও পড়েছি এই যুদ্ধে নাকি দেব-দেবীরাও ছিলেন? এটা কি ঠিক?
শিক্ষক: গল্পের বর্ণনায় তাই বলা হয়েছে। দেব-দেবীরাও নাকি দুই দলে ভাগ হয়ে গিয়েছিলেন। কেউ গ্রিকদের সাহায্য করতেন, কেউবা ট্রোজানদের। যেহেতু দেবতাদের মৃত্যু নেই, তাই তাদের হস্তক্ষেপের কারণে যুদ্ধ আর শেষ হতে চাইছিল না। এমনকি দেবতারা নিজেরাও নাকি মাঝেমধ্যে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তেন!
ছাত্র: দেবতারা কি আসলেই তখন যুদ্ধ করতে আসতেন?
শিক্ষক: না, বইয়ে পরিষ্কার বলা হয়েছে এগুলো আসলে মানুষের কল্পনা। আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে মানুষের যখন বিজ্ঞানের জ্ঞান ছিল না, তখন তারা নিজেদের জীবনের সব ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে দেব-দেবীর লীলা বলে মনে করত। গ্রিক কবিরা এভাবেই তাঁদের মহাকাব্যে দেবতাদের চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।
ছাত্র: তার মানে এটা নিছক একটা গল্প?
শিক্ষক: গল্প হলেও এটি মানুষের বীরত্ব এবং প্রাচীন চিন্তাধারার এক অপূর্ব দলিল। তৎকালীন মানুষ চারপাশের রহস্য ব্যাখ্যা করার জন্য এই কাল্পনিক চরিত্রগুলোর সাহায্য নিত। এভাবেই গ্রিক সাহিত্যের এই অমর কাহিনীগুলো গড়ে উঠেছে।
মহাকাব্যিক আখ্যান: রহস্যময় প্রকৃতি, মানবিক দেবতা ও ওডিসিইউস
ছাত্র: স্যার, আগেই বলছিলেন যে মানুষ তখন দেব-দেবীদের কল্পনা করত। কিন্তু কেন? তারা কি শুধু যুদ্ধের জন্যই দেবতাদের ডাকত?
শিক্ষক: না রে, শুধু যুদ্ধ নয়। আসলে তখনকার দিনে মানুষের কাছে বিজ্ঞানের কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। প্রতিদিন সূর্য কেন ওঠে আর ডোবে, সমুদ্রে কেন হঠাৎ ঝড় ওঠে কিংবা আকাশে কেন বজ্রপাত হয়—এসবের কোনো কারণ তারা জানত না। তাই তারা মনে করত এগুলো কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির কাজ। আর বিপদে পড়লে যখন কোনো কূল-কিনারা পাওয়া যেত না, তখন মানুষ এই দেবতাদের ওপরই ভরসা করত।
ছাত্র: কিন্তু গ্রিক দেবতাদের কথা শুনলে তো মনে হয় তারা সাধারণ মানুষের মতোই ছিল, তাই না?
শিক্ষক: একদম ঠিক ধরেছ! গ্রিক দেবতাদের বিশেষত্ব এখানেই। তাঁরা দেখতে যেমন মানুষের মতো ছিলেন, তাঁদের রাগ, অনুরাগ আর ভালোবাসাও ছিল ঠিক আমাদের মতোই। তাঁরা মাঝেমধ্যে মানুষের ছদ্মবেশ ধরে পৃথিবীতে আসতেন, কাউকে সাহায্য করতেন আবার কাউকে বিপদেও ফেলতেন। এমনকি যুদ্ধের হার-জিত বা হঠাৎ নেমে আসা অন্ধকারকেও মানুষ দেবতাদের কারসাজি বলে মনে করত।
ছাত্র: তার মানে একজন দক্ষ তীরন্দাজের লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়াকেও তারা দেবতাদের কাজ মনে করত?
শিক্ষক: ঠিক তাই! তারা ভাবত কোনো দেবতা হয়তো হাত দিয়ে তীরটি সরিয়ে দিয়েছেন। গ্রিকদের এই কল্পনাশক্তি ছিল অসাধারণ। তারা এমনভাবে কাহিনীগুলো বুনেছে যা একাধারে সাহসী আবার যুক্তিসম্মত। পৃথিবীজুড়ে মানুষ আজও এই কাহিনীগুলো পড়ে আনন্দ পায়।
ছাত্র: এই বিশাল আর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ওডিসিইউসের ভূমিকা ঠিক কেমন ছিল? অন্য বীরদের চেয়ে তিনি কি আলাদা ছিলেন?
শিক্ষক: ওডিসিইউস বীরত্বের দিক থেকে অন্য গ্রিক বীরদের মতোই অকুতোভয় ছিলেন। তবে যেখানে তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন, তা হলো তাঁর বিচক্ষণতা বা বুদ্ধি। অনেক বীর হয়তো শক্তিতে বড় ছিলেন, কিন্তু ওডিসিইউস ছিলেন বুদ্ধিতে সেরা। চরম বিপদেও তিনি কখনো ধৈর্য হারাতেন না বা আশা ছাড়তেন না। তাঁর এই স্থির মস্তিষ্ক আর বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশলই তাঁকে ট্রয়ের যুদ্ধে এক অনন্য মর্যাদা দিয়েছিল।
ছাত্র: বুঝলাম স্যার। মানে শুধু গায়ের জোর নয়, মাথা খাটিয়ে লড়াই করাটাই ছিল ওডিসিইউসের আসল শক্তি।
শিক্ষক: চমৎকার বলেছ! বুদ্ধির জয় যে সব জায়গায়, ওডিসিইউসের চরিত্রটি তারই একটি বড় প্রমাণ।
ট্রয়ের ঘোড়া: ওডিসিইউসের কালজয়ী উদ্ভাবন
শিক্ষক: ওডিসিইউসের আরেকটি বড় গুণ ছিল তাঁর উদ্ভাবনী শক্তি। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে তাঁর কোনো জুড়ি ছিল না।
ছাত্র: ওই যে ট্রয়ের যুদ্ধের 'কাঠের ঘোড়া'র কথা আমরা শুনি, ওটাও কি ওডিসিইউসেরই বুদ্ধি ছিল?
শিক্ষক: হ্যাঁ, একদমই তাই। তবে মনে রাখবে, বুদ্ধিটা শুধু ঘোড়া তৈরিতে ছিল না, আসল বুদ্ধি ছিল সেটার ব্যবহারে। দশ বছর ধরে যুদ্ধ চলায় গ্রিকরা তখন ভীষণ অস্থির আর বিরক্ত হয়ে পড়েছিল। তারা দেশ ছেড়ে এসেছিল অল্প দিনে যুদ্ধ শেষ করে ফিরে যাবে বলে, কিন্তু কোনোভাবেই ট্রয়ের প্রাচীর ভাঙতে পারছিল না।
ছাত্র: তারা কি যুদ্ধ ছেড়ে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবেনি?
শিক্ষক: অসম্ভব! এত বছর যুদ্ধ করার পর রানী হেলেনকে উদ্ধার না করে আর ট্রোজানদের শাস্তি না দিয়ে ফিরে গেলে গ্রিকদের মান-সম্মান থাকত না। দেশবাসী বা নিজেদের কাছে মুখ দেখানোর উপায় থাকত না। তাই যেভাবেই হোক ট্রয় নগরীর ভেতরে ঢোকাটা জরুরি ছিল।
ছাত্র: এই অসম্ভব কাজটাই কি ওডিসিইউস সম্ভব করেছিলেন?
শিক্ষক: ঠিক তাই। তিনি ওই বিশাল কাঠের ঘোড়া তৈরির পরিকল্পনা করলেন। তারপর নিজে কয়েকজন বাছা বাছা যোদ্ধা নিয়ে ওই ঘোড়ার পেটের ভেতর লুকিয়ে পড়লেন। কাজটা ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর। অনেকে ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ওডিসিইউস যখন নিজেই সবার আগে ঢোকার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন বাকিরাও সাহস পেল।
ছাত্র: বাকি গ্রিক সৈন্যরা তখন কী করল?
শিক্ষক: তারা এক দারুণ অভিনয় করল! ট্রোজান পাহারাদারেরা একদিন সকালে অবাক হয়ে দেখল, গ্রিকরা তাদের তাবুগুলো সব পুড়িয়ে ফেলেছে। তারপর তারা জাহাজে উঠে মাঝসমুদ্রে চলে গেল। দেখে মনে হচ্ছিল যেন গ্রিকরা পরাজয় মেনে নিয়ে চিরতরে তাদের দেশে ফিরে যাচ্ছে।
ছাত্র: ট্রোজানরা কি তাহলে বিশ্বাস করেছিল যে তারা জিতে গেছে?
শিক্ষক: দৃশ্যত তাই মনে হচ্ছিল। কিন্তু তারা জানত না যে সেই ফেলে রাখা বিশাল কাঠের ঘোড়ার ভেতরেই লুকিয়ে আছে তাদের ধ্বংসের কারিগর ওডিসিইউস আর তাঁর সঙ্গীরা!
ট্রয়ের মহাযুদ্ধ: শুরু থেকে শেষ
ছাত্র: স্যার, ট্রয়ের যুদ্ধের কাহিনীটা তো খুব দীর্ঘ। সবকিছুর শুরুটা ঠিক কীভাবে হয়েছিল? আর ওডিসিইউস কেনই বা অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেখানে গেলেন?
শিক্ষক: খুব চমৎকার প্রশ্ন। আসলে ওডিসিইউস ছিলেন ইথাকা দ্বীপের রাজা। তিনি তাঁর স্ত্রী আর ছোট্ট শিশুকে নিয়ে শান্তিতে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্পার্টার রানী হেলেনকে যখন ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস অপহরণ করে নিয়ে গেলেন, তখন সব গ্রিক রাজারা একজোট হলেন। ওডিসিইউস প্রথমে পাগল সেজে যুদ্ধ এড়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর চালাকি ধরা পড়ে যায়। ফলে এক হাজার যুদ্ধ-জাহাজের বিশাল বাহিনীর সাথে তাঁকেও রওনা হতে হয় ট্রয়ের দিকে।
ছাত্র: কিন্তু স্যার, যুদ্ধটা তো শুনেছি দশ বছর ধরে চলেছিল। কেন এত সময় লাগল?
শিক্ষক: কারণ ট্রয় নগরী ছিল খুব শক্তিশালী প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। গ্রিকরা সেই প্রাচীর ভেদ করতে পারছিল না। ওদিকে তখনকার মানুষ মনে করত এই যুদ্ধের পেছনে দেব-দেবীদের হাত আছে। যেহেতু তখন বিজ্ঞান ছিল না, তাই ঝড়, বিদ্যুৎ বা যুদ্ধে হার-জিত—সবকিছুকেই তারা দেবতাদের লীলা ভাবত। মজার ব্যাপার হলো, গ্রিকদের কল্পনায় দেবতারা ছিলেন অবিকল মানুষের মতো—যাঁদের রাগ, হিংসা বা পক্ষপাতিত্ব সবই ছিল।
ছাত্র: তাহলে শেষ পর্যন্ত গ্রিকরা জিতল কীভাবে? শুধু গায়ের জোরে?
শিক্ষক: না, এখানেই ওডিসিইউসের মহিমা। যখন গ্রিকরা দশ বছর যুদ্ধ করে ক্লান্ত আর হতাশ, তখন ওডিসিইউস এক অদ্ভুত ফন্দি আঁটলেন। তিনি এক বিশাল কাঠের ঘোড়া তৈরি করালেন এবং নিজে কয়েকজন সৈন্য নিয়ে তার ভেতরে লুকিয়ে পড়লেন। বাকি গ্রিক সৈন্যরা তাদের তাবু পুড়িয়ে দিয়ে জাহাজে করে চলে যাওয়ার ভান করল।
ছাত্র: ট্রয়বাসীরা কি সেটা বিশ্বাস করেছিল?
শিক্ষক: হ্যাঁ! তারা ভাবল গ্রিকরা হার মেনে পালিয়ে গেছে। তারা পরম উল্লাসে সেই বিশাল ঘোড়াটিকে টেনে নগরের ভেতরে নিয়ে এল। এমনকি ঘোড়া ঢোকানোর জন্য তারা নিজেদের নগরের দরজাও ভেঙে বড় করল। সারা রাত নাচ-গান আর উৎসব করে ট্রয়বাসীরা যখন ক্লান্ত হয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই ঘটল আসল ঘটনা।
ছাত্র: ওডিসিইউস কি তখন বেরিয়ে এলেন?
শিক্ষক: ঠিক তাই। গভীর রাতে ওডিসিইউস আর তাঁর সঙ্গীরা ঘোড়ার ভেতর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এসে নগরের প্রধান ফটক খুলে দিলেন। ওদিকে গ্রিক জাহাজগুলো রাতের অন্ধকারে আবার ফিরে এসেছিল। খোলা দরজা দিয়ে গ্রিক সেনারা শহরে ঢুকে পড়ল এবং পুরো ট্রয় নগরীতে আগুন লাগিয়ে দিল।
ছাত্র: তারপর কী হলো? ট্রয়বাসীরা কি বাধা দেয়নি?
শিক্ষক: ট্রোজানরা অপ্রস্তুত অবস্থায় ছিল। গ্রিকরা সেই রাতে চরম নিষ্ঠুরতা দেখাল। তারা বৃদ্ধ, শিশু কাউকেই রেহাই দিল না। এমনকি গ্রিকদের এই নৃশংসতা দেখে তাদের সমর্থক দেবতারাও নাকি রেগে গিয়েছিলেন। এভাবেই ধ্বংস হলো ঐতিহাসিক ট্রয় নগরী। ওডিসিইউসের বিচক্ষণতা না থাকলে হয়তো এই যুদ্ধ কখনোই শেষ হতো না।
ছাত্র: তার মানে বুদ্ধির জোরেই তারা অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ওডিসিইউস কি বাড়িতে ফিরে যেতে পেরেছিলেন?
শিক্ষক: হ্যাঁ, যুদ্ধ শেষ হলো। ওডিসিইউস বারোটি জাহাজ নিয়ে তাঁর প্রিয় ইথাকার পথে রওনা দিলেন। তবে সেই ফেরার পথও ছিল অনেক রহস্য আর রোমাঞ্চে ভরা, যা আমরা 'ওডিসি' মহাকাব্যে জানতে পারি।
ওডিসিইউসের অন্তহীন যাত্রা:
যুদ্ধ থেকে ঘরে ফেরা
ছাত্র: স্যার, ট্রয় তো ধ্বংস হলো। তারপর ওডিসিইউস কি সহজেই তাঁর প্রিয় ইথাকায় ফিরতে পেরেছিলেন?
শিক্ষক: না রে, সেখানেই তো গল্পের আসল মোড়। ট্রয়ের যুদ্ধ চলল দশ বছর, আর সেই যুদ্ধ শেষ করে বাড়ি ফিরতে ওডিসিইউসের লাগল আরও দশ বছর! অর্থাৎ মোট ২০ বছর তিনি ঘরছাড়া ছিলেন।
ছাত্র: আরও দশ বছর! কেন? পথে কি আবার কোনো বাধা এল?
শিক্ষক: এবার শত্রু কোনো মানুষ ছিল না, ওডিসিইউসকে লড়তে হয়েছিল খোদ প্রকৃতির বিরুদ্ধে। পথে পথে ছিল দানব, ডাইনী আর মায়াবী সব বিপদ। কোথাও সমুদ্রের দানব তাঁকে চিবিয়ে খেতে চেয়েছিল, কোথাও বা মায়াবী ডাইনীর মন্ত্রে তাঁর সঙ্গীরা পশুতে পরিণত হয়েছিল।
ছাত্র: আমি শুনেছি মায়াবী সাইরেনদের গানের কথা, যারা গান শুনিয়ে নাবিকদের ধ্বংস করত। ওডিসিইউস কি তাদের মুখেও পড়েছিলেন?
শিক্ষক: হ্যাঁ, ওডিসিইউস সেই সাইরেনদের মায়াবী গান শুনেছিলেন যা শুনলে মানুষ সব ভুলে যায় এবং ধীরে ধীরে শুকিয়ে মারা যায়। তাঁর সঙ্গীরা একে একে সবাই মারা পড়ল—কেউ প্রকৃতির রুদ্র রোষে, কেউবা নিজেদের বোকামি আর লোভের কারণে। কিন্তু ওডিসিইউস ছিলেন অদম্য। তাঁর যে বিখ্যাত উদ্ভাবনী শক্তি ট্রয় জয় করেছিল, সেই বুদ্ধিতেই তিনি সব বিপদ কাটিয়ে বেঁচে রইলেন।
ছাত্র: তাঁর তো তখন খুব একা লাগত, তাই না স্যার? কেন তিনি এত কষ্ট সহ্য করেও এগিয়ে যাচ্ছিলেন?
শিক্ষক: তাঁর মনে শুধু একটিই লক্ষ্য ছিল—নিজের দেশ 'ইথাকা'। সেখানে তাঁর স্ত্রী পেনিলোপি আর তাঁর আদরের পুত্র টেলেমেকাস তাঁর পথ চেয়ে বসে আছে। বইয়ের ভাষায়, চুম্বক লোহাকে যেমন নিজের দিকে টেনে নেয়, ইথাকাও তেমনি ওডিসিইউসকে টানছিল। শত বিপদ আর দুঃখের মাঝেও তিনি বাড়ি ফেরার আশা কখনো ছাড়েননি।
ছাত্র: শেষ পর্যন্ত কি তিনি ইথাকায় পৌঁছাতে পারলেন? পরিবার কি তাঁকে চিনতে পেরেছিল?
শিক্ষক: বিশ বছর পর ওডিসিইউস যখন একা ইথাকায় পা রাখলেন, তখন সেখানে তাঁকে চেনার মতো কেউ ছিল না। ২০ বছরে তিনি বদলে গিয়েছেন, তাঁর বয়স বেড়েছে, জৌলুস হারিয়েছে। এমনকি তাঁর রাজ্যে তখন কোনো ঢাক-ঢোল বাজেনি। রাজা হিসেবে নয়, তিনি ফিরেছিলেন একজন নিঃস্ব পথিকের বেশে।
ছাত্র: ২০ বছর পর নিজের দেশেই তিনি অচেনা হয়ে গেলেন! কী অদ্ভুত পরিণতি।
শিক্ষক: ঠিক তাই। তবে এটাই তো ওডিসি মহাকাব্যের সার্থকতা। যে বীর দশ বছর যুদ্ধ করে এবং দশ বছর সমুদ্রের সাথে লড়াই করে জয়ী হলেন, তাঁর আসল পরীক্ষা কিন্তু নিজের ঘরে ফিরেই শুরু হলো।
ওডিসিইউসের মহাকাব্যিক সমাপ্তি: ইথাকা বিজয় ও পরিবারের পুনর্মিলন
ছাত্র: স্যার, ওডিসিইউস তো একা আর ছদ্মবেশে ইথাকায় ফিরলেন। কিন্তু তাঁর রাজ্যে তখন কী অবস্থা ছিল? কেউ কি তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল?
শিক্ষক: বিশ বছর তো কম সময় নয়! সবাই ধরে নিয়েছিল ওডিসিইউস আর বেঁচে নেই। এই সুযোগে আশেপাশের রাজ্যের প্রায় ১০০ জন লোভী ‘পাত্র’ বা রাজপ্রার্থী তাঁর প্রাসাদে আস্তানা গেড়েছিল। তারা শুধু রানীর পাণিপ্রার্থীই ছিল না, বরং রাজবাড়িতে দিনরাত ভোজবাজি আর হইহুল্লোড় করে ওডিসিইউসের সম্পদ ধ্বংস করছিল।
ছাত্র: তাঁর ছেলে টেলেমেকাস কি তাদের বাধা দেয়নি?
শিক্ষক: টেলেমেকাস তখন বড় হয়েছে, কিন্তু ওই একশ জন দস্যুর সামনে সে ছিল বড় অসহায়। একদিকে বাবার কোনো খবর নেই, অন্যদিকে এই সুযোগসন্ধানী লোকগুলো তাকে প্রতিনিয়ত টিটকারি দিত। তার মনে কোনো শান্তি ছিল না।
ছাত্র: আচ্ছা স্যার, রানী পেনিলোপি কি ওই লোকগুলোর কাউকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলেন?
শিক্ষক: মোটেও না! ওডিসিইউস যেমন বুদ্ধিমান ছিলেন, পেনিলোপিও ছিলেন তেমনি বিচক্ষণ। তিনি ওই পাত্রদের হাত থেকে বাঁচতে এক চমৎকার ফন্দি আঁটলেন। তিনি রটিয়ে দিলেন যে, তাঁর বৃদ্ধ শ্বশুরের জন্য একটি কাফনের কাপড় বুনছেন; সেটি শেষ হলেই তিনি কাউকে বিয়ে করবেন।
ছাত্র: এতে কাজ হলো? তারা কি অপেক্ষা করতে রাজি হলো?
শিক্ষক: হলো, তবে সেখানেও পেনিলোপি এক চালাকি করতেন। তিনি সারাদিন কাপড় বুনতেন, আর রাতে গোপনে তা আবার খুলে ফেলতেন! এভাবে তিনি বছরের পর বছর সময় কাটিয়ে দিচ্ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাঁর বাড়িরই এক লোক এই গোপন কথাটি দস্যুদের জানিয়ে দেয়। ফলে পেনিলোপি চরম বিপদে পড়ে যান।
ছাত্র: ঠিক এই চরম উত্তেজনার মুহূর্তেই কি ওডিসিইউস প্রাসাদে হাজির হলেন?
শিক্ষক: একদম ঠিক সময়ে! ওডিসিইউস গোপনে প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। প্রথমে কেউ চিনতে না পারলেও পুত্র টেলেমেকাস তাঁর পিতাকে চিনতে পারল। ২০ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আর বীরত্ব নিয়ে পিতা-পুত্র মিলে সেই প্রাসাদের ভেতরেই আক্রমণ করলেন ওই পাপিষ্ঠ পাত্রদের।
ছাত্র: তার মানে ওডিসিইউস একাই তাদের হারিয়ে দিলেন?
শিক্ষক: হ্যাঁ, ওডিসিইউস আর টেলেমেকাস মিলে তাদের সবাইকে হত্যা করলেন। যে পরিবারটি বিশ বছর আগে ভেঙে গিয়েছিল, ওডিসিইউসের সাহস আর বুদ্ধিতে সেটি আবার নতুন জীবন পেল। এভাবেই এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর বীরত্বগাথার সমাপ্তি ঘটল।
ছাত্র: অসাধারণ স্যার! ওডিসিইউসের জীবনের প্রতিটি বাঁকেই দেখছি বুদ্ধির জয়। গায়ের জোরের চেয়ে যে মাথা খাটানো বেশি জরুরি, এই মহাকাব্যটি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
শিক্ষক: ঠিক বলেছ। বিপদে ধৈর্য না হারিয়ে আশাবাদী থাকা এবং সঠিক সময়ে বুদ্ধির ব্যবহার করাই একজন প্রকৃত বীরের পরিচয়। ওডিসিইউসের গল্প আমাদের এটাই শেখায়।
মহাকাব্যিক আখ্যান: ট্রয়ের যুদ্ধ ও ওডিসিইউসের জয়যাত্রা
ছাত্র: স্যার, ট্রয়ের যুদ্ধ আর ওডিসিইউসের এই কাহিনীগুলো আমরা জানলাম কোত্থেকে? এগুলো কি কোনো নির্দিষ্ট বইয়ে লেখা আছে?
শিক্ষক: খুব ভালো প্রশ্ন। এই মহান কাহিনীগুলো আমরা জানতে পারি প্রাচীন গ্রিক কবি হোমারের দুটি মহাকাব্য থেকে—'ইলিয়াড' এবং 'ওডিসি'। হোমারকে বলা হয় পশ্চিম ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচীন কবি। মজার ব্যাপার হলো, শোনা যায় তিনি নাকি অন্ধ ছিলেন! অথচ তাঁর বর্ণনা এতই স্পষ্ট যে পড়লে মনে হয় সবকিছু চোখের সামনে ঘটছে।
ছাত্র: একটা মানুষের পক্ষে কি এত বড় দুটো মহাকাব্য লেখা সম্ভব?
শিক্ষক: এটা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। অনেকে মনে করেন হোমার হয়তো একা নন, অনেকের মুখে শোনা কাহিনীগুলো তিনি সুগঠিত রূপ দিয়েছেন। তবে 'ইলিয়াড' আর 'ওডিসি'র মধ্যে একটা বড় পার্থক্য আছে। 'ইলিয়াড'-এর নায়ক একিলিস ছিলেন খুব রাগী আর অল্পতেই হতাশ হয়ে পড়তেন। কিন্তু 'ওডিসি'-র নায়ক ওডিসিইউস ছিলেন একদম আলাদা—শান্ত মেজাজ আর গভীর আশাবাদী।
যুদ্ধের সূত্রপাত ও ওডিসিইউসের অনিচ্ছা
ছাত্র: কিন্তু স্যার, সবকিছুর শুরুটা ঠিক কীভাবে হয়েছিল? ওডিসিইউস কেন যুদ্ধে যেতে চাননি?
শিক্ষক: ওডিসিইউস ছিলেন ইথাকা দ্বীপের রাজা। তিনি তাঁর স্ত্রী পেনিলোপি আর ছোট্ট শিশু টেলেমেকাসকে নিয়ে শান্তিতে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্পার্টার রানী হেলেনকে যখন ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস অপহরণ করে নিয়ে গেলেন, তখন সব গ্রিক রাজারা একজোট হলেন। ওডিসিইউস পাগল সেজে যুদ্ধ এড়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর চালাকি ধরা পড়ে যায়। ফলে এক হাজার যুদ্ধ-জাহাজের বিশাল বাহিনীর সাথে তাঁকেও রওনা হতে হয়।
দশ বছরের যুদ্ধ ও দেবতাদের ভূমিকা
ছাত্র: কিন্তু স্যার, যুদ্ধটা কেন দশ বছর ধরে চলল?
শিক্ষক: কারণ ট্রয় নগরী ছিল খুব শক্তিশালী প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। ওদিকে তখনকার মানুষ মনে করত এই যুদ্ধের পেছনে দেব-দেবীদের হাত আছে। যেহেতু তখন বিজ্ঞান ছিল না, তাই ঝড়, বিদ্যুৎ বা যুদ্ধে হার-জিত—সবকিছুকেই তারা দেবতাদের লীলা ভাবত। গ্রিক দেবতারা ছিলেন মানুষের মতোই—তাঁদের রাগ, অনুরাগ আর পক্ষপাতিত্ব সবই ছিল।
ওডিসিইউসের বুদ্ধির জয়: ট্রয়ের ঘোড়া
ছাত্র: তাহলে শেষ পর্যন্ত গ্রিকরা জিতল কীভাবে?
শিক্ষক: এখানেই ওডিসিইউসের মহিমা। যখন গ্রিকরা ক্লান্ত আর হতাশ, তখন ওডিসিইউস এক অদ্ভুত ফন্দি আঁটলেন। তিনি এক বিশাল কাঠের ঘোড়া তৈরি করালেন এবং নিজে কয়েকজন সৈন্য নিয়ে তার ভেতরে লুকিয়ে পড়লেন। বাকি গ্রিকরা পালানোর ভান করল। ট্রয়বাসীরা আনন্দ করে সেই ঘোড়াটি নগরের ভেতরে নিয়ে এল। রাতে ওডিসিইউস বেরিয়ে এসে নগরের ফটক খুলে দিলেন এবং গ্রিকরা পুরো ট্রয় ধ্বংস করে দিল।
দশ বছরের দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা
ছাত্র: যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ওডিসিইউস কি বাড়িতে ফিরে যেতে পেরেছিলেন?
শিক্ষক: যুদ্ধ শেষ হলো, কিন্তু বাড়ি ফিরতে তাঁর আরও দশ বছর লাগল! অর্থাৎ মোট ২০ বছর তিনি ঘরছাড়া ছিলেন। পথে পথে তাঁকে লড়তে হয়েছিল প্রকৃতির রুদ্র রোষ, দানব, ডাইনী আর মায়াবী সাইরেনদের গানের বিরুদ্ধে। তাঁর সব সঙ্গী মারা গেল, কিন্তু ওডিসিইউস ছিলেন অদম্য। চুম্বক লোহাকে যেমন টানে, ইথাকাও ওডিসিইউসকে তেমনি টানছিল।
ইথাকায় প্রত্যাবর্তন ও রাজপ্রাসাদ উদ্ধার
ছাত্র: ২০ বছর পর ফিরে তিনি তাঁর রাজ্যকে কেমন দেখলেন?
শিক্ষক: বিশৃঙ্খল! সবাই ভেবেছিল রাজা মারা গেছেন। ১০০ জনের মতো লোভী রাজপ্রার্থী তাঁর প্রাসাদে বসে তাঁর সম্পদ ধ্বংস করছিল আর রানী পেনিলোপিকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিল। পেনিলোপিও কিন্তু বুদ্ধিতে কম ছিলেন না। তিনি কাপড় বোনার বাহানায় সময় কাটিয়ে দিচ্ছিলেন। দিনে বুনতেন আর রাতে খুলে ফেলতেন!
ছাত্র: শেষ পর্যন্ত ওডিসিইউস কি তাঁর রাজ্য উদ্ধার করতে পারলেন?
শিক্ষক: হ্যাঁ, ওডিসিইউস যখন ছদ্মবেশে প্রাসাদে ফিরলেন, পুত্র টেলেমেকাস তাঁকে চিনতে পারল। এরপর পিতা-পুত্র মিলে সেই দস্যুদের হত্যা করে রাজ্য আর পরিবারকে নতুন জীবন দিলেন। এভাবেই হোমার তাঁর মহাকাব্যে বীরত্ব, বুদ্ধি আর ভালোবাসার এক অমর আখ্যান রেখে গেছেন।
ছাত্র: স্যার, ট্রয়ের যুদ্ধ আর ওডিসিইউসের এই কাহিনীগুলো আমরা জানলাম কোত্থেকে? এগুলো কি কোনো নির্দিষ্ট বইয়ে লেখা আছে?
শিক্ষক: খুব ভালো প্রশ্ন। এই মহান কাহিনীগুলো আমরা জানতে পারি প্রাচীন গ্রিক কবি হোমারের দুটি মহাকাব্য থেকে—'ইলিয়াড' এবং 'ওডিসি'। হোমারকে বলা হয় পশ্চিম ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচীন কবি। মজার ব্যাপার হলো, শোনা যায় তিনি নাকি অন্ধ ছিলেন, অথচ তাঁর কল্পনাশক্তি ছিল অসামান্য।
ছাত্র: একটা মানুষের পক্ষে কি এত বড় দুটো মহাকাব্য লেখা সম্ভব?
শিক্ষক: অনেকে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তবে দুই মহাকাব্যের ভাষার মিল আর বর্ণনার কৌশল দেখে অনেকেই মনে করেন হোমার একজনই ছিলেন। 'ইলিয়াড'-এর নায়ক একিলিস ছিলেন রাগী ও হতাশ মেজাজের, কিন্তু 'ওডিসি'-র নায়ক ওডিসিইউস ছিলেন শান্ত মেজাজ আর গভীর আশাবাদী।
যুদ্ধের সূত্রপাত ও ওডিসিইউসের অনিচ্ছা
ছাত্র: স্যার, ট্রয়ের যুদ্ধের মূল কারণটা কী ছিল? আর ওডিসিইউস কেন যুদ্ধে যেতে চাননি?
শিক্ষক: ওডিসিইউস ছিলেন ইথাকার রাজা। তিনি তাঁর স্ত্রী পেনিলোপি আর শিশুকে নিয়ে শান্তিতে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস যখন স্পার্টার রানী হেলেনকে অপহরণ করে নিয়ে যান, তখন গ্রিক রাজারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। ওডিসিইউস পাগল সেজে যুদ্ধ এড়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দূতের হাতে ধরা পড়ে যান। এক হাজার গ্রিক যুদ্ধ-জাহাজ ট্রয়ের দিকে রওনা হয়।
দশ বছরের যুদ্ধ ও দেবতাদের ভূমিকা
ছাত্র: যুদ্ধটা কি খুব দীর্ঘ ছিল?
শিক্ষক: হ্যাঁ, একটানা দশ বছর চলেছিল এই যুদ্ধ। ট্রয় নগরীর দেয়াল ছিল অত্যন্ত মজবুত। মজার ব্যাপার হলো, সেকালের মানুষ মনে করত দেব-দেবীরাও দুই দলে ভাগ হয়ে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তখন বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা জানা ছিল না বলে মানুষ প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোকে দেবতাদের কারসাজি মনে করত।
ওডিসিইউসের বুদ্ধির জয়: ট্রয়ের ঘোড়া
ছাত্র: শেষ পর্যন্ত গ্রিকরা জিতল কীভাবে?
শিক্ষক: ওডিসিইউসের উদ্ভাবনী বুদ্ধিতে। তিনি একটি বিশাল কাঠের ঘোড়া তৈরির পরিকল্পনা করেন। গ্রিকরা পালানোর অভিনয় করে সমুদ্রের ওপাড়ে লুকিয়ে থাকে আর ট্রোজানরা আনন্দ করে সেই ঘোড়াটি নগরের ভেতরে নিয়ে যায়। রাতে ওডিসিইউস ও তাঁর সঙ্গীরা ঘোড়ার ভেতর থেকে বেরিয়ে নগরের দরজা খুলে দেন এবং ট্রয় ধ্বংস হয়।
দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা ও ইথাকায় প্রত্যাবর্তন
ছাত্র: যুদ্ধ শেষে ওডিসিইউস কি বাড়িতে ফিরতে পেরেছিলেন?
শিক্ষক: ফিরতে তাঁর আরও দশ বছর লাগল! অর্থাৎ মোট ২০ বছর তিনি ঘরছাড়া ছিলেন। পথে দানব, ডাইনী আর সাইরেনদের মায়াবী গানের মতো অসংখ্য বিপদ তাঁকে সইতে হয়েছে। তাঁর সব সঙ্গী মারা গেলেও তিনি কখনো আশা ছাড়েননি।
ছাত্র: বিশ বছর পর ইথাকায় ফিরে তিনি কী দেখলেন?
শিক্ষক: রাজ্যে তখন চরম বিশৃঙ্খলা। একশ জনেরও বেশি রাজপ্রার্থী তাঁর প্রাসাদে আস্তানা গেড়ে পেনিলোপিকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিল। পেনিলোপি কাপড় বোনার বাহানায় সময় নিচ্ছিলেন—দিনে বুনতেন আর রাতে তা খুলে ফেলতেন! শেষ পর্যন্ত ওডিসিইউস ছদ্মবেশে ফিরে পুত্র টেলেমেকাসের সাহায্যে সব দস্যুদের হত্যা করেন এবং পরিবার ফিরে পান।
ছাত্র: অসাধারণ স্যার! ওডিসিইউসের এই ধৈর্য আর বুদ্ধি আসলেও অনন্য।
শিক্ষক: ঠিক তাই। তাঁর এই মানবিক গুণগুলোই তাঁকে মহাকাব্যের শ্রেষ্ঠ বীর হিসেবে অমর করে রেখেছে।
Continuous............
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হন!